আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ ছিলেন মাহফুজ আহমেদ। সাবলীল অভিনয়, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার দক্ষতায় তিনি জায়গা করে নেন দর্শকের হৃদয়ে। নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই অভিনেতা। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও রয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতা। আজ ২৩ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন।
অভিনয়ে আসার আগে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাহফুজ আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ‘সাপ্তাহিক পূর্ণিমা’য় রাজনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ও সংবাদ তৈরির মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে একসময় অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে নিয়ে আসে টেলিভিশনের পর্দায়। অভিনয়শিল্পী না হলে সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে চালিয়ে যেতেন বলে বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন তিনি।
মাহফুজ আহমেদের অভিনয়জীবনের শুরু ‘কোন কাননের ফুল’ নাটকের মাধ্যমে। ইমদাদুল হক মিলনের লেখা নাটকটিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। চরিত্রটিতে সংলাপও ছিল মাত্র একটি। কিন্তু সেই ছোট সুযোগকেই নিজের পথচলার শুরু হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যান, যোগাযোগ রাখেন টেলিভিশন অঙ্গনের সঙ্গে এবং ধীরে ধীরে অভিনয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেন।
তাঁর পরিচিতি বাড়ে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এ মতি চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। নাটকটির জনপ্রিয়তা তাঁকে দর্শকের কাছে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তী সময়ে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত ও আফসানা মিমির মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রীর বিপরীতে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। ‘শুরুর কবিতা’ ও ‘তোমাকে ছুঁয়ে’র মতো নাটকেও দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন।
ছোটপর্দায় মাহফুজের উল্লেখযোগ্য কাজের তালিকায় রয়েছে ‘আমাদের নুরুল হুদা’, ‘চৈতা পাগল’, ‘একান্নবর্তী’ ও ‘দেবদাস’। ‘আমাদের নুরুল হুদা’ ধারাবাহিকে নামভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। নুরুল হুদা চরিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনে আলাদা পরিচিতি যোগ করে। এ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারও পেয়েছেন। ‘একান্নবর্তী’ নাটকে ফরহাদ চরিত্র এবং ‘দেবদাস’ টেলিফিল্মে নামভূমিকায় তাঁর অভিনয়ও দর্শকের মনে দাগ কাটে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা হিসেবেও নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন মাহফুজ আহমেদ। ‘চৈতা পাগল’ ধারাবাহিক পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দেন। পরে ‘তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা’সহ একাধিক নাটক পরিচালনা করেন। তাঁর পরিচালিত কাজগুলোর মধ্যেও দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে বেশ কয়েকটি নাটক।
চলচ্চিত্রে মাহফুজ আহমেদের যাত্রা শুরু নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ দিয়ে। এরপর ‘দুই দুয়ারী’তে অভিনয় করেন তিনি। তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ‘জয়যাত্রা’ এবং ‘মেঘের পরে মেঘ’সহ আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করে বড় পর্দায় নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
২০০৫ সালে ‘লাল সবুজ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পান মাহফুজ আহমেদ। পরে অনিমেষ আইচ পরিচালিত ‘জিরো ডিগ্রি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয়বার একই পুরস্কার অর্জন করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ‘জিরো ডিগ্রি’ প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। (Bangla Movie Database)
দীর্ঘ বিরতির পর চয়নিকা চৌধুরী পরিচালিত ‘প্রহেলিকা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় ফেরেন মাহফুজ। ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওটিটি কনটেন্টেও কাজ করেছেন এই অভিনেতা। সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের ধরন ও চরিত্র নির্বাচনে পরিবর্তন এলেও দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অটুট রয়েছে।
জন্মদিনে নিজের অনুভূতি জানিয়ে মাহফুজ আহমেদ বলেন, “সবার আশীর্বাদ ও ভালোবাসা চাই। মানুষের দোয়া অনেক কিছু। সবাই দোয়ায় রাখবেন।”
সাংবাদিকতা থেকে অভিনয়, ছোট চরিত্র থেকে দর্শকপ্রিয় নায়ক, আর অভিনয় থেকে নির্মাণ ও প্রযোজনা মাহফুজ আহমেদের দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। জন্মদিনে ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা, আগামী দিনেও নতুন ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে তাঁকে পর্দায় দেখা যাবে।
আপনার মতামত লিখুন :