আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: কনসার্টে শিল্পীর গান শোনার চেয়ে স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণেই যেন এখন বেশি ব্যস্ত থাকেন অনেক দর্শক। সেই প্রবণতার বিপরীতে ব্যতিক্রমী বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন কে-পপ বয় ব্যান্ড কর্টিস। মঞ্চে উঠেই দর্শকদের উদ্দেশে তাদের আহ্বান—‘ফোনটা নামিয়ে রাখুন।’
এই বার্তাকেই সামনে রেখে ব্যান্ডটির প্রথম একক ট্যুরের নাম রাখা হয়েছে ‘PUT YOUR PHONE DOWN’। গত ১৮ ও ১৯ জুলাই ইনচিওনের ইনস্পায়ার অ্যারেনায় দুই দিনের কনসার্টের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সফরটি। এরপর টরন্টো, নিউইয়র্ক, আটলান্টা, আরভিং ও লস অ্যাঞ্জেলেসসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে কনসার্ট করবে তারা। পরে সিউল ও জাপানের কানাগাওয়াতেও পারফর্ম করবে ব্যান্ডটি। মোট নয়টি শহরে ১৪টি আয়োজনের মধ্য দিয়ে চলবে এই সফর।
ইনচিওনের উদ্বোধনী কনসার্টে পাঁচ সদস্যের ব্যান্ডটি মঞ্চে ওঠার পর দর্শকদের সরাসরি ফোন নামিয়ে রাখার আহ্বান জানায়। সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামজুড়ে উল্লাস শুরু হলেও অনেক দর্শকের হাতে থাকা মোবাইলের আলো তখনো জ্বলছিল। কেউ কেউ ফোন সরিয়ে নিলেও অনেকে ভিডিও ধারণ চালিয়ে যান।
কর্টিসের বার্তার মূল উদ্দেশ্য অবশ্য দর্শকদের নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং কনসার্টের মুহূর্তটিকে সরাসরি উপভোগ করা। ব্যান্ডটির ট্যুরের নামের মধ্যেও সেই ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে—স্মার্টফোনের পর্দার বদলে মঞ্চের শিল্পীদের দিকে তাকানো এবং একই মুহূর্তে একসঙ্গে আনন্দ করা।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকের মতে, একটি বড় কনসার্টে স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণ করা তাদের স্মৃতি ধরে রাখার অন্যতম উপায়। বিশেষ করে প্রিয় শিল্পীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ জীবনে বারবার আসে না বলে অনেকে সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করতে চান।
অন্যদিকে কিছু দর্শক মনে করেন, ফোন সরিয়ে রেখে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করার অভিজ্ঞতাই আলাদা। ইনচিওনের কনসার্টে এমন দর্শকদের দেখা গেছে, যারা মোবাইল হাতে না রেখে গান ও নাচের সঙ্গে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। ব্যান্ডের প্রত্যাশাও মূলত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে কোনো পর্দা থাকবে না।
কে-পপ সংস্কৃতিতে অবশ্য স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ‘ফ্যানক্যাম’ নামে পরিচিত নির্দিষ্ট শিল্পীকে কেন্দ্র করে ধারণ করা ভিডিওগুলো নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে ভক্তরা শিল্পীদের নাচ, অভিব্যক্তি ও মঞ্চের ছোট ছোট মুহূর্ত বিশ্লেষণ করেন। ফলে অনেকের কাছে কনসার্টে ভিডিও ধারণ শুধু স্মৃতি সংরক্ষণ নয়, কে-পপ সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই কারণেই কর্টিসের ‘ফোন নামিয়ে রাখুন’ বার্তা কিছু ভক্তের কাছে অস্বস্তিকরও মনে হয়েছে। বিশেষ করে কনসার্টের টিকিট, যাতায়াত ও থাকার পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে আসা দর্শকদের কেউ কেউ মনে করেন, নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কিছু মুহূর্ত ভিডিও করার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
তবে দ্বিতীয় দিনের কনসার্টে ব্যান্ডটির অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেখা যায় বলে ভক্তদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে। তাদের বক্তব্যের সারকথা ছিল—ভিডিও করতে চাইলে করা যেতে পারে, কিন্তু পুরো কনসার্ট যেন শুধু মোবাইলের পর্দায় আটকে না যায়। অর্থাৎ ‘PUT YOUR PHONE DOWN’ শুধু ফোন নিষিদ্ধ করার বার্তা নয়; বরং বর্তমান মুহূর্তকে সরাসরি অনুভব করার আহ্বান।
গত বছরের আগস্টে আত্মপ্রকাশ করা কর্টিস ইতোমধ্যে কে-পপ অঙ্গনে দ্রুত পরিচিতি পেয়েছে। পাঁচ সদস্যের এই দলটির সদস্যরা হলেন মার্টিন, জেমস, জুহুন, সিওংহিয়ন ও কিওনহো। ব্যান্ডটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিগহিট মিউজিক, যে লেবেল বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বিটিএসের সঙ্গেও যুক্ত।
কর্টিস নামটি এসেছে ‘Color Outside the Lines’ ধারণা থেকে। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা ও সৃজনশীলতার প্রকাশই তাদের নামের দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম একক ট্যুরের নামেও সেই ব্যতিক্রমী মানসিকতার ছাপ রয়েছে।
কর্টিস অবশ্য কনসার্টে দর্শকদের ফোন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা প্রথম শিল্পী নয়। এর আগেও ফিবি ব্রিজার্স ও অ্যালিসিয়া কিজের মতো শিল্পীরা বিশেষ লক করা পাউচ ব্যবহারের মাধ্যমে কনসার্টে ফোন ব্যবহার সীমিত করেছেন। আবার বিলি আইলিশের মতো শিল্পীরা দর্শকদের ফোন নামিয়ে সরাসরি পারফরম্যান্স উপভোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে কর্টিসের ‘PUT YOUR PHONE DOWN’ সফর শুধু একটি কনসার্ট ট্যুর নয়, বরং স্মার্টফোননির্ভর দর্শক-অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে—একটি লাইভ কনসার্টের স্মৃতি কি ফোনের গ্যালারিতে জমা রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সেই মুহূর্তটিকে কোনো পর্দা ছাড়াই অনুভব করা? কর্টিস অন্তত তাদের উত্তরটি পরিষ্কার করে দিয়েছে—কখনো কখনো ফোনটা নামিয়ে রেখে শিল্পীর চোখের দিকে তাকানোই হতে পারে আসল কনসার্ট অভিজ্ঞতা।
আপনার মতামত লিখুন :