আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: একসময় নতুন গান প্রকাশের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল ক্যাসেটের ফিতা, অ্যালবামের দোকান এবং রেডিও-টেলিভিশনে প্রিয় শিল্পীর গান শোনার অপেক্ষা। এরপর বাজারে আসে সিডি, মোবাইল রিংটোন ও ওয়েলকাম টিউন। এমপি৩ ও অবৈধ ডাউনলোড একসময় সেই ব্যবসায় বড় ধাক্কা দেয়। তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত সংগীতকে নিয়ে যায় আরও বড় এক ডিজিটাল জগতে।
ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে এখন একটি গান প্রকাশের পর তার জনপ্রিয়তা শুধু শ্রোতার সংখ্যায় মাপা হয় না। কতবার গানটি শোনা হয়েছে, কত ভিউ হয়েছে, কোথায় ব্যবহার হয়েছে, কতটা শেয়ার হয়েছে এবং সেই ব্যবহারের বিপরীতে কার কী অধিকার রয়েছে—এসব বিষয়ও হয়ে উঠেছে সংগীত ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর সংগীত লেবেলগুলোর নির্ভরতা নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণাতেও এই রূপান্তরের চিত্র উঠে এসেছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে দুই হাজার সালের শুরুর সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সংগীতের প্রধান বাণিজ্যিক পণ্য ছিল অডিও ক্যাসেট। একটি অ্যালবাম প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, রেকর্ডিং স্টুডিও, শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, প্রচ্ছদশিল্পী, মুদ্রণ ও পরিবেশনা ব্যবস্থা, দোকান এবং অসংখ্য কর্মী।
একটি অ্যালবাম সফল হলে তার প্রভাব পড়ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায়। কিন্তু এমপি৩, ইন্টারনেট এবং অবৈধ ডাউনলোডের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতার হাতে অল্প সময়েই শত শত গান পৌঁছে যায়। এতে ফিজিক্যাল অ্যালবামের বিক্রি দ্রুত কমতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে সিডিও সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশে ফিজিক্যাল মিউজিক পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রি এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে বাংলাদেশের পাঁচটি বড় সংগীত লেবেলের ডিজিটাল কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, কীভাবে পুরোনো ব্যবসায়িক কাঠামো বদলে অনলাইনভিত্তিক মডেল তৈরি হয়েছে।
ফিজিক্যাল অ্যালবামের পতনের মধ্যেই মোবাইল ফোন সংগীতের জন্য তৈরি করেছিল নতুন একটি বাজার। জনপ্রিয় গানের কয়েক সেকেন্ডের অংশ রিংটোন কিংবা ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ব্যবহারের জন্য শ্রোতারা অর্থ ব্যয় করতেন।
এই সময় গান ব্যবহারের অনুমতি, কপিরাইট এবং রয়্যালটির বিষয়গুলোও আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেটের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবসাও আগের গুরুত্ব হারায়। শ্রোতার গান শোনার অভ্যাস চলে যায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।
বাংলাদেশের সংগীত ব্যবসায় ইউটিউবের আগমন ছিল বড় পরিবর্তনের সূচনা। এখন একটি গান প্রকাশের জন্য অ্যালবাম বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হয় না। বরং একটি গান বা মিউজিক ভিডিওকে ডিজিটাল দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বড় সংগীত লেবেলগুলোর ডিজিটাল আয়ের ক্ষেত্রে ইউটিউব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি তাদের প্রধান আয় উৎস।
ইউটিউবের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন, মনিটাইজেশন, কনটেন্ট আইডি, সাবস্ক্রাইবার এবং ব্র্যান্ড সহযোগিতা থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে আগে যেখানে একটি অ্যালবাম কত কপি বিক্রি হলো সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন, এখন সেখানে একটি গান কত ভিউ পেল, কতবার শোনা হলো বা কত মানুষের কাছে পৌঁছাল—এসব হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এর ফলে শিল্পীদের জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন স্বাধীনতা। বড় কোনো লেবেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে অনেক শিল্পী নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গান প্রকাশ করছেন। ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউটর বা অ্যাগ্রিগেটরদের মাধ্যমে একই গান ইউটিউব মিউজিক, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
ইউটিউবের পাশাপাশি স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকসহ বৈশ্বিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম সংগীতের অর্থনীতিকে আরও পরিবর্তন করেছে। ক্যাসেট বা সিডির মতো গান একবার বিক্রি হয়ে শেষ হয়ে যায় না; একটি গান বারবার শোনা হলে সংশ্লিষ্ট অধিকার ও লাইসেন্সের ভিত্তিতে আয় তৈরির সুযোগ থাকে।
তবে ‘স্ট্রিম’ মানেই সরাসরি শিল্পীর ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়া নয়। সংগীতের অর্থনীতি এখানে বেশ জটিল। রেকর্ডিংয়ের অধিকার, গানের কথা ও সুরের স্বত্ব, লেবেল, পরিবেশক, প্রকাশক এবং সংশ্লিষ্ট অধিকার ব্যবস্থাপনার ধরন অনুযায়ী অর্থের ভাগ নির্ধারিত হয়। Spotify-এর নিজস্ব ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মটি নির্দিষ্ট ‘প্রতি স্ট্রিম’ মূল্য দেয় না; মোট স্ট্রিমের অংশ বা streamshare অনুযায়ী রয়্যালটি হিসাব করা হয় এবং পরে চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিল্পী ও স্রষ্টাদের মধ্যে অর্থ বণ্টিত হয়।
ফলে একজন শিল্পীর জন্য শুধু গান জনপ্রিয় হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিজের গান ও রেকর্ডিংয়ের মালিকানা, চুক্তির শর্ত এবং রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন থাকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল সংগীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম রিলস, টিকটক ও শর্ট ভিডিওর মাধ্যমে। একটি গান পুরোপুরি না শুনেও তার কয়েক সেকেন্ডের অংশ ভাইরাল হয়ে যেতে পারে। সেই জনপ্রিয়তা আবার মানুষকে মূল গান বা মিউজিক ভিডিওর দিকে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ এখন একটি গান শুধু একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি হয় না। একই গান ইউটিউব, অডিও স্ট্রিমিং, শর্ট ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্টে আলাদা আলাদাভাবে নতুন শ্রোতা তৈরি করতে পারে।
এই পরিবর্তন সংগীত প্রচারের খরচ ও কৌশলও বদলে দিয়েছে। আগে পোস্টার, ব্যানার, পত্রিকার বিজ্ঞাপন, রেডিও-টেলিভিশন প্রচার ছিল গুরুত্বপূর্ণ; এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, শর্ট ভিডিও, ইনফ্লুয়েন্সার, প্লেলিস্ট ও অ্যালগরিদমভিত্তিক প্রচার।
ডিজিটাল যুগে গান প্রকাশ সহজ হলেও কপিরাইট ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি গানের অডিও রেকর্ডিংয়ের অধিকার এবং সেই গানের কথা-সুরের অধিকার এক বিষয় নয়। ফলে গান কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, কে তা আপলোড করছে এবং কোন পক্ষ সেই ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে এসবের ওপর রয়্যালটির হিসাব নির্ভর করে।
ডিজিটাল অ্যাগ্রিগেটররা এখন শিল্পী ও লেবেলকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গান পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মেটাডেটা, লাইসেন্স, রয়্যালটি রিপোর্ট এবং কপিরাইট ব্যবস্থাপনাতেও সহায়তা করছে। ইউটিউবের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাগ্রিগেটররা সংগীতের অডিও ফাইল ও মেটাডেটা প্ল্যাটফর্মে সরবরাহ করার পাশাপাশি আয়সংক্রান্ত রিপোর্টও দিতে পারে।
বাংলাদেশের সংগীতশিল্পেও তাই এখন বড় প্রশ্ন শুধু ‘গান কতটা জনপ্রিয় হলো’ নয়—‘গানের স্বত্ব কার কাছে আছে’ এবং ‘সেই জনপ্রিয়তা থেকে অর্থ কীভাবে শিল্পী ও স্রষ্টার কাছে পৌঁছাচ্ছে’ এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাসেট থেকে সিডি, রিংটোন থেকে ইউটিউব এবং সেখান থেকে বৈশ্বিক স্ট্রিমিং মাত্র কয়েক দশকে বাংলাদেশের সংগীত ব্যবসা একাধিকবার তার কাঠামো বদলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই এই শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
এআই, স্বয়ংক্রিয় মিউজিক প্রোডাকশন, ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন এবং শর্ট ভিডিওর বিস্তার ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করবে। তবে প্রযুক্তি যতই বদলাক, একটি গানের দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের কেন্দ্রে থাকবে শ্রোতার ভালোবাসা, সৃজনশীলতা এবং শিল্পীর নিজস্ব পরিচয়।
একসময় একটি গানকে মানুষের ঘরে পৌঁছাতে ক্যাসেটের দোকানের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে হাতের মুঠোয়। সেই সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতা, কপিরাইটের জটিলতা এবং নিজের সৃষ্টির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও। তাই বাংলাদেশের গানের বাজারের ভবিষ্যৎ এখন শুধু নতুন গান তৈরিতে নয়, সেই গানকে সঠিকভাবে ডিজিটালভাবে ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন করার ওপরও নির্ভর করছে।
আপনার মতামত লিখুন :