আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: যোগাযোগের দুনিয়ায় মানুষ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। এক ক্লিকেই দূরের মানুষকে পাওয়া যাচ্ছে, মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অথচ এই অতিরিক্ত সংযুক্তির ভিড়েই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় যে দম্পতিরা সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে একে অপরের সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য অপেক্ষা করতেন, তাদের অনেকের হাতেই এখন সেই সময়টুকু দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। সকালের নাশতার টেবিল থেকে রাতের শোবার ঘর—অনেক ক্ষেত্রেই পাশাপাশি বসে থেকেও দুজন ডুবে থাকছেন আলাদা ডিজিটাল জগতে।
অবশ্য ফোনে কতক্ষণ সময় কাটানো হচ্ছে, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—ফোন ব্যবহারের কারণে আপনি আপনার প্রিয় মানুষটিকে কতটা সময়, মনোযোগ ও গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত করছেন।
গবেষণায় এই আচরণকে বলা হয় ‘ফাবিং’ (Phubbing)—ফোনের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে সামনে থাকা মানুষটিকে উপেক্ষা করা। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর উপস্থিতিতে নিয়মিত ফোনে ব্যস্ত থাকা সম্পর্কের সন্তুষ্টির সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে এতে সঙ্গীর মনে উপেক্ষিত বা বাদ পড়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও সাড়াদান কমে যেতে পারে।
সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরেছেন। দুজন পাশাপাশি বসেছেন। কিন্তু একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, অন্যজন ভিডিও দেখায় ব্যস্ত। কেমন গেল দিন—এই সাধারণ প্রশ্নটিও আর করা হচ্ছে না।
সম্পর্ক তৈরি হয় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট কথোপকথন, অনুভূতি ভাগাভাগি এবং মনোযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই ছোট মুহূর্তগুলো যদি নিয়মিত ফোনের স্ক্রিন দখল করে নেয়, তাহলে ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
আপনি হয়তো সঙ্গীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলছেন। নিজের দিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন কিংবা কোনো সুখবর জানাচ্ছেন। কিন্তু আপনার সামনে থাকা মানুষটির চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ফোনের স্ক্রিনে।
এমন পরিস্থিতিতে কথার চেয়ে ফোনটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। বারবার এমন অভিজ্ঞতা হলে সঙ্গীর মধ্যে ‘আমি কি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নই?’—এই প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফাবিংয়ের নেতিবাচক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সঙ্গীর মনে বর্জিত বা উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি এবং সঙ্গীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ার ধারণা।
একটি সম্পর্কের সুন্দর দিক হলো—সব সময় কথা বলার প্রয়োজন হয় না। কখনো পাশাপাশি চুপচাপ বসে থাকা, একসঙ্গে চা খাওয়া কিংবা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকাও সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিটি মুহূর্ত যদি ফোনের নোটিফিকেশন দেখা, স্ক্রলিং কিংবা ভিডিও দেখায় কেটে যায়, তাহলে একসঙ্গে থাকার অর্থটাই ধীরে ধীরে বদলে যায়।
একই ঘরে থেকেও দুজন তখন নিজেদের আলাদা ডিজিটাল জগতে বসবাস করতে শুরু করেন।
‘তুমি সব সময় ফোন নিয়ে থাকো’—দাম্পত্য সম্পর্কে এমন অভিযোগ কি এখন নিয়মিত শুনতে হচ্ছে?
যদি ফোন ব্যবহারের সময় নিয়ে বারবার ঝগড়া বা মনোমালিন্য তৈরি হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু স্ক্রিন টাইমে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এর পেছনে থাকতে পারে আরও গভীর একটি অনুভূতি—‘তুমি আমাকে সময় দিচ্ছ না।’
ফোন তখন সমস্যার মূল কারণের পাশাপাশি সেই জমে থাকা অভিমান ও হতাশার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে। গবেষণাতেও ফোন ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট দ্বন্দ্বকে সম্পর্কের সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত পাওয়া গেছে।
আপনি হয়তো জানেন কোন তারকা কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, কে কোথায় ঘুরতে গেছেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার পুরোনো বন্ধুটি কী পোস্ট করেছেন।
কিন্তু শেষ কবে আপনি আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেছেন—‘তুমি কেমন আছ?’
আপনি কি জানেন, সে ইদানীং কী নিয়ে চিন্তিত? কোন বিষয়টি তাকে আনন্দ দিচ্ছে? ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কোনো নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়েছে কি না?
অপরিচিত মানুষের জীবন যখন আপনার মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নেয়, অথচ আপনার পাশে থাকা মানুষটির অনুভূতিগুলো অজানাই থেকে যায়, তখন সম্পর্কের ভেতরে দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
আসলে বিষয়টি এত সরল নয়। স্মার্টফোন নিজে সম্পর্কের শত্রু নয়। বরং ফোন কীভাবে এবং কখন ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জরুরি কাজ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, বিনোদন কিংবা দূরের প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলা—সবকিছুর জন্যই প্রযুক্তি প্রয়োজনীয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ফোন সামনে থাকা মানুষটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাই সম্পর্ক ভালো রাখতে প্রতিদিন কিছু সময় শুধু দুজনের জন্য রাখা যেতে পারে। খাবারের টেবিলে ফোন দূরে রাখা, ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ স্ক্রিনমুক্ত থাকা কিংবা সঙ্গী কথা বলার সময় ফোন সরিয়ে চোখে চোখ রাখা—এমন ছোট অভ্যাসই অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সম্পর্ক শুধু একই ছাদের নিচে থাকা নয়; একসঙ্গে থাকা মানুষটির প্রতি মনোযোগী হওয়াই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আপনার মতামত লিখুন :