আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: দক্ষিণ ভারতীয় তারকা বিজয় বরাবরই ছিলেন অন্যদের চেয়ে আলাদা। সিনেমার প্রচারণা, সাক্ষাৎকার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন তুলনামূলকভাবে নিরব। পর্দার বাইরের জীবন সম্পর্কে ভক্তদের জানাশোনাও ছিল সীমিত। অথচ সেই বিজয়ই আজ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। তার এই উত্থান যেন এক বাস্তব রূপকথা।
আজ ২২ জুন বিজয়ের জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক তার অভিনয় ও রাজনৈতিক জীবনের অনন্য যাত্রাপথ।
বিজয়ের জন্ম চলচ্চিত্র পরিবারে। তার বাবা এস. এ. চন্দ্রশেখর ছিলেন তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নির্মাতা। বাবার পরিচালিত ১৯৮৪ সালের চলচ্চিত্র ‘ভেটরি’-তে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে।
এক সাক্ষাৎকারে চন্দ্রশেখর জানিয়েছিলেন, সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিজয় পেয়েছিলেন মাত্র ৫০০ রুপি। তখন কেউ ভাবতেও পারেননি, একদিন এই শিশুশিল্পীই দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন হয়ে উঠবেন।
বর্তমানে বিজয়ের পারিশ্রমিক ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘জন নায়গন’-এর জন্য তিনি প্রায় ২২০ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছেন।
মাত্র ৫০০ রুপি থেকে ২২০ কোটি রুপিতে পৌঁছানোর এই যাত্রা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বিস্ময়কর সাফল্যের গল্প।
নব্বইয়ের দশকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঘিল্লি’ চলচ্চিত্র বিজয়ের ক্যারিয়ারে বড় মোড় এনে দেয়। এরপর তিনি ‘মাস হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
পরবর্তী সময়ে ‘কাথি’, ‘মার্সাল’, *‘বিগিল’*সহ একাধিক চলচ্চিত্রে সামাজিক বার্তা তুলে ধরে দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন। কৃষকের দুর্দশা, স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলো তার চলচ্চিত্রে গুরুত্ব পায়।
যখন অনেক অভিনেতা প্যান-ইন্ডিয়ান সিনেমার দিকে ঝুঁকেছেন, তখনও বিজয় মূলত তামিল চলচ্চিত্রেই কাজ করেছেন। তবুও তার জনপ্রিয়তা কমেনি।
‘লিও’ বিশ্বব্যাপী ৬০০ কোটির বেশি এবং ‘দ্য গ্রেটেস্ট অব অল টাইম’ ৪০০ কোটির বেশি আয় করে। এই সাফল্য তার তারকাখ্যাতির শক্তিশালী প্রমাণ।
অনেকের মতে, বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তার সিনেমাগুলোর মাধ্যমেই। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা দিতে শুরু করেন।
২০২০-এর দশকে এসে দুর্নীতি, বেকারত্ব, শিক্ষার চাপ ও সুশাসনের মতো বিষয় নিয়ে নিয়মিত কথা বলতে থাকেন। এসব বক্তব্য তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
অবশেষে পূর্ণ সময়ের রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে অভিনয়জীবন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিজয়ের ভাষায়, “রাজনীতি আংশিকভাবে করা যায় না; জনগণ পূর্ণ সময়ের নেতা চায়।”
বিজয়ের ঘোষিত শেষ চলচ্চিত্র ‘জন নায়গন’ এখন মুক্তির অপেক্ষায়। ছবিটির সংলাপ ও গল্পে রাজনৈতিক বার্তার উপস্থিতি স্পষ্ট।
একটি আলোচিত সংলাপে বলা হয়েছে—“রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।” অনেকে এটিকে বিজয়ের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনের আগে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, বিজয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬০৩ কোটি রুপি। এর মধ্যে স্থাবর ও অস্থাবর উভয় ধরনের সম্পদ রয়েছে।
তার সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে কৃষিজমি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, ব্যাংক আমানত এবং বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার আয় ছিল প্রায় ১৮৪ কোটি রুপি।
সম্প্রতি বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর স্ত্রী সংগীতা স্বর্ণলিঙ্গম বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শিশুশিল্পী হিসেবে ৫০০ রুপি পারিশ্রমিক পাওয়া সেই ছেলেটি আজ তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। অভিনয়, জনপ্রিয়তা, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বিজয়ের জীবন যেন এক সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
ভক্তদের ভাষায়, এটি শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক অসাধারণ উদাহরণ।
আপনার মতামত লিখুন :