আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান কত হওয়া উচিত দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের আগে কিংবা পরে অনেকের মনেই এমন প্রশ্ন আসে। কেউ মনে করেন কাছাকাছি বয়সের দম্পতির মধ্যে বোঝাপড়া বেশি হয়, আবার কারও মতে বয়সের ব্যবধান বেশি হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকলে সম্পর্ক সুন্দরভাবে টিকে থাকতে পারে।
বাস্তবে গবেষণা এমন কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ব্যবধানকে ‘আদর্শ’ হিসেবে নির্ধারণ করেনি। অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত একটি গবেষণায় বয়সে ভিন্ন দম্পতিদের বৈবাহিক সন্তুষ্টি সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বয়সে বেশি পার্থক্য থাকা দম্পতিদের বৈবাহিক সন্তুষ্টি সময়ের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বয়সের ব্যবধান বেশি হলেই দাম্পত্য জীবন অসুখী হবে।
বয়সের পার্থক্য সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন জীবনযাপনের ধরন, অবসর পরিকল্পনা, সন্তান নেওয়ার সময়, আর্থিক সিদ্ধান্ত কিংবা ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে দুজনের ভাবনায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে। বয়সের ব্যবধান যত বাড়ে, দুজনের জীবনের ভিন্ন পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।
তবে এসব বিষয় বয়সের সংখ্যার চেয়ে ব্যক্তির মানসিক পরিপক্বতা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করে। একই বয়সের দুজন মানুষের মধ্যেও মতবিরোধ হতে পারে, আবার ১০ বা ১৫ বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও অনেক দম্পতি দীর্ঘদিন সুখে সংসার করছেন।
বৈজ্ঞানিকভাবে ৫ বছর, ৭ বছর বা ১০ বছর কোনোটিকেই সবার জন্য আদর্শ বলা যায় না। বরং সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুজনের পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, খোলামেলা যোগাযোগ, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সামঞ্জস্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বয়সের ব্যবধান বেশি হলে দুজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান গুরুত্ব থাকা জরুরি। বয়সে বড় একজন যেন বয়সের কারণে অন্যজনের ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন সম্পর্কের সুস্থতার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের ব্যবধানের চেয়ে সন্তান নেওয়ার সময় দুজনের বয়স কত এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নারীর ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে প্রজননক্ষমতা কমে যায়। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG) জানিয়েছে, নারীর প্রজননক্ষমতা ৩০-এর পর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ৩৭ বছরের পর এই পতন আরও দ্রুত হয়। ৪০ বছর বয়সে প্রতি মাসিক চক্রে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে।
তবে পুরুষের ক্ষেত্রেও বয়সের প্রভাব রয়েছে, যদিও তা নারীর মতো নির্দিষ্ট বয়সে হঠাৎ কমে যায় না। ACOG-এর তথ্য অনুযায়ী, পুরুষের প্রজননক্ষমতাও বয়সের সঙ্গে কমে, তবে এর মাত্রা ও সময় ব্যক্তি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণের ওপর নির্ভর করে।
এ কারণে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে শুধু স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান নয়, দুজনের প্রকৃত বয়স, স্বাস্থ্য, প্রজননক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে থাকার জন্য বয়সের ব্যবধান একমাত্র নির্ধারক নয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং সমস্যার সময় একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
গবেষণাতেও বয়সের ব্যবধানের সঙ্গে বৈবাহিক সন্তুষ্টির কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেলেও সেটিকে কোনো চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে দেখা হয়নি। তাই ৫ থেকে ৭ বছরের ব্যবধানকে ‘সেরা’ কিংবা ২০ বছরের ব্যবধানকে ‘খারাপ’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।
দিনশেষে সুখী দাম্পত্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দুজন মানুষ একে অপরকে কতটা বোঝেন, সম্মান করেন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কতটা সমানভাবে ভাগ করে নিতে পারেন। বয়সের ব্যবধান তাই সম্পর্কের একটি বিষয় হতে পারে, কিন্তু সম্পর্কের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়।
আপনার মতামত লিখুন :