আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: জন্মদিন কখনো ঘটা করে উদযাপন করেন না তিনি। ভক্ত ও অনুরাগীরাই নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপন করেন। এবারও জন্মদিনের আগের দিন রাজধানীর পূর্বাচলের একটি ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন ‘নগর বাউল’খ্যাত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস। ব্যান্ড সংগীতের অতীত ও বর্তমান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রয়াত সহশিল্পীদের স্মৃতি, নতুন গান এবং জীবনদর্শন সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
আশির দশকের তরুণ জেমস আর ২০২৬ সালের জেমসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন কি না, এমন প্রশ্নে হেসে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। শুধু মাথায় আগের চেয়ে চুল কিছুটা কমে গেছে, এ ছাড়া আর কিছু না।’
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে পূর্বাচলের ওই ক্লাবে পৌঁছান জেমস। চোখে কালো সানগ্লাস, পরনে হালকা কালো টি-শার্ট ও জলপাই রঙের ট্রাউজার। হাসিমুখে সবার সঙ্গে হাত মেলানোর পর শুরু হয় ছবি তোলার পর্ব। একপর্যায়ে সবাইকে থামিয়ে নিজের গোঁফ ঠিক করে নিয়ে জানতে চান, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’ পরে ছবি তোলার সময় রসিকতা করে বলেন, ‘এই চেহারা নিয়ে এর চেয়ে আর ভালো ছবি হবে না।’
এরই মধ্যে একটি কেক নিয়ে হাজির হন আয়োজকদের একজন। আগাম জন্মদিন উদযাপনের সেই আয়োজনে অংশ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বসেন জেমস। শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। সংগীতজীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত উপলব্ধি নিয়ে সাবলীলভাবে কথা বলেন তিনি। কথার ফাঁকে ফাঁকে ছিল হাস্যরসও।
অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা জেমস। কীভাবে এত গান তৈরি করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সব সময় পরিকল্পনা করে গান তৈরি করেন না। অনেক সময় মুহূর্তের অনুভূতি থেকেই গান তৈরি হয়ে যায়।
জেমসের ভাষায়, ‘অত ভেবেচিন্তে বা পরিকল্পনা করে হয়নি। গান তৈরির একটা হিট অব দ্য মোমেন্ট আছে। ন্যাচারালি চলে আসে, আর গান তৈরি হয়ে যায়। জোরাজুরি করে সৃষ্টিশীল কিছু হয় না।’
গানের সংগীতায়োজনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পছন্দ করেন তিনি। প্রথমে গানের একটি মৌলিক কাঠামো তৈরি করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে সেটিকে পূর্ণতা দেন। তাঁর মতে, গানের মূল ভাব ঠিক রেখে পরিবর্তনের সুযোগ থাকাটা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটা গানকে সলিড বা টাইট কিছু হিসেবে না রেখে ফ্রেমটিকে লুজ রাখার চেষ্টা করি, যেন মূলভাব ঠিক রেখে প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যায়।’
জেমস জানান, তাঁর কিছু গান আগে সুর তৈরি করে, পরে সেই সুরের সঙ্গে কথা মিলিয়ে লেখা হয়েছে। আবার কিছু গানের ক্ষেত্রে প্রথমে কথা তৈরি হয়েছে, পরে এসেছে সুর। তবে কথা ও সুর একই সঙ্গে তৈরি হওয়া গানই তাঁর বেশি পছন্দ।
আড্ডায় উঠে আসে প্রয়াত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর প্রসঙ্গ। দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ও সংগীতজীবনের ঘনিষ্ঠ মানুষটিকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেমস। বাচ্চুর সঙ্গে কাটানো সময়, আড্ডা এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণা করেন তিনি।
জেমস জানান, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অত্যন্ত আড্ডাপ্রিয় ও রসিক মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা শুরু হলে কখন যে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যেত, তা বোঝা যেত না। দুজনের মধ্যে সংগীত নিয়ে আলোচনা ও ব্যক্তিগত আলাপেরও ছিল আলাদা আবহ।
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। সেই স্মৃতি মনে করে জেমস বলেন, ‘এই লোকটাকে আমি সবসময় মিস করি। কোনো কারণ ছাড়াই হুট করে এভাবে চলে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে বাচ্চু ভাইয়ের ওপর ভীষণ রাগও হয়।’
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে টেলিফোনে শেষ কথোপকথনের প্রসঙ্গও ওঠে আড্ডায়। তবে সেই আলাপের বিস্তারিত প্রকাশ করতে চাননি জেমস। স্মৃতির সেই অংশ নিজের কাছেই রাখতে চেয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া কবি শামসুর রাহমান, গিটারিস্ট নিলয় দাশ ও সংগীত পরিচালক লাকী আখান্দের কথাও স্মরণ করেন এই শিল্পী। শামসুর রাহমানের লেখা ‘উত্তর’ কবিতা অবলম্বনে তৈরি ‘তারায় তারায়’ গানটি তাঁর বিশেষ প্রিয়। কবি তাঁর জন্য আরও কয়েকটি গান লিখে দিয়েছিলেন বলেও জানান জেমস। তবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত সুর করা বা রেকর্ডিংয়ের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আশির দশকের সংগীতচর্চার পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে জেমস তুলে ধরেন সেই সময়ের স্টুডিও সংস্কৃতির স্মৃতি। তখন একজন শিল্পীর রেকর্ডিংয়ের সময় অন্য শিল্পীরাও স্টুডিওতে উপস্থিত থাকতেন। একসঙ্গে আড্ডা, সংগীত নিয়ে আলোচনা এবং একে অন্যের কাজ থেকে শেখার সুযোগ ছিল নিয়মিত।
জেমসের রেকর্ডিংয়ে আইয়ুব বাচ্চু যেমন উপস্থিত থাকতেন, তেমনি বাচ্চুর রেকর্ডিংয়ের সময়ও যেতেন জেমস। এভাবেই শিল্পীদের মধ্যে গড়ে উঠত পারস্পরিক যোগাযোগ ও সংগীত নিয়ে ভাবনা বিনিময়ের পরিবেশ।
তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে বলে মনে করেন তিনি। এখন অনেক শিল্পী নিজস্ব হোম স্টুডিওতে ল্যাপটপের মাধ্যমে গান তৈরি করছেন। ফলে আগের মতো একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া কিংবা সংগীত নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ কমেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জেমস বলেন, ‘বর্তমানে সেই স্টুডিও কালচার উঠে গেছে। সবাই ল্যাপটপ নিয়ে হোম স্টুডিও তৈরি করে নিজেদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।’
বর্তমান সংগীতশিল্পে প্রযুক্তির প্রভাব এবং নতুন প্রজন্মের সংগীতচর্চা নিয়েও নিজের ভাবনা তুলে ধরেন জেমস। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন আসবেই। নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি ভালোবাসা ও নিষ্ঠা ধরে রাখাও জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআই এখন নিজে থেকেই কোডিং করতে পারছে। ফলে বিভিন্ন পেশায় কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। তবে কোনো শিল্প বা সৃষ্টিশীল ধারা হারিয়ে যাওয়ার মুখে পড়লেও মানুষের ভালোবাসা ও প্যাশনের কারণে তা টিকে থাকতে পারে।
সংগীত এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজলভ্য। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে শ্রোতারা সহজেই পুরোনো ও নতুন গান শুনতে পারছেন। তবে এই সহজলভ্যতার কারণে অনেক সময় গানের প্রতি মানুষের মনোযোগ কমে যাচ্ছে বলেও মনে করেন জেমস। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এখন অনেক শ্রোতা পুরো গান না শুনেই অন্য গানে চলে যান।
এমন পরিস্থিতিতে সংগীতচর্চার মূল প্রেরণা হিসেবে ভালোবাসা ও প্যাশনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জেমসের ভাষায়, ‘যা কিছু করতে হবে, কেবল প্যাশন ও ভালোবাসা থেকেই করতে হবে। কোনো লাভের চিন্তা থেকে মিউজিক করা যাবে না। কিছু যদি নিজ থেকেই এসে যায় তো ভালো, কিন্তু লাভের আশা করলে হতাশ হতে হবে।’
নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের প্রতিও তাঁর ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। তরুণেরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভালো সংগীত তৈরি করতে পারলে তাতে আপত্তির কোনো কারণ দেখেন না তিনি। এআইসহ আধুনিক প্রযুক্তিকে সৃজনশীল কাজে ব্যবহারের পক্ষেও মত দেন এই শিল্পী।
সংগীতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জেমসের বক্তব্য, গান মানুষের শোনা ও গাওয়ার জন্য। তাই মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন জায়গায় গান গাইবে, এতে অযথা বাধা দেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি নদীর মতো, একে আপন গতিতে বইতে দিতে হয়।
জীবনকে কীভাবে দেখেন এমন প্রশ্নের উত্তরে জেমসের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘টেক ইট ইজি’। অর্থাৎ জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার পক্ষপাতী তিনি। তাঁর মতে, একজন শিল্পী চাইলে সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কথা বলতে পারেন। তবে সেটি নির্ভর করে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি ও চিন্তাভাবনার ওপর।
নিজের ভূমিকা সম্পর্কে জেমস বলেন, ‘আমি একজন ইন্টারটেইনার, মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি।
সমাজের কল্যাণে তাঁর পরামর্শও সহজ। পুরো সমাজকে একসঙ্গে বদলে দেওয়ার চিন্তা না করে প্রত্যেকে নিজের ও আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করতে পারেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাব সমাজের ওপরও পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
জীবনের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়েও বিশেষ কোনো হিসাব-নিকাশ করেন না জেমস। তাঁর কাছে জীবন মানেই আনন্দ। অতীতের অপ্রাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ না করে নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতেই পছন্দ করেন তিনি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে জনপ্রিয়তা ও শ্রোতাদের প্রত্যাশা নিয়ে কোনো চাপ অনুভব করেন কি না, এমন প্রশ্নে হেসে ওঠেন জেমস। রসিকতা করে বলেন, ‘এই চাপের কারণেই তো আপাতত গানবাজনা করছি না। চাপমুক্ত হলে আবার নতুন গান নিয়ে ভাবব।’
নতুন গান প্রকাশের বিষয়ে আপাতত কোনো তাড়াহুড়ো নেই জেমসের। তবে সংগীতচর্চা থেকে দূরে নেই তিনি। এখনো সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন স্টুডিওতে নিয়মিত অনুশীলন করেন। গাড়িতে যাতায়াতের সময়ও গান শোনেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় ২০ মিনিটের আড্ডা শেষে পাশের কক্ষে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে সবাই ঠিকমতো বসেছেন কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখেন জেমস। নাশতা শেষে সবাইকে নিয়ে কেক কাটেন তিনি। পুরো সময়জুড়েই ছিল তাঁর হাসিমুখ ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নেন ‘নগর বাউল’। সাংবাদিকেরা একে একে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। গাড়িতে ওঠার আগে সবার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলেন, ‘ভালো থাকিস।
সংগীতের প্রতি ভালোবাসা, পুরোনো সহশিল্পীদের স্মৃতি, প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং জীবনকে সহজভাবে দেখার দর্শন সব মিলিয়ে জেমসের এই আড্ডায় উঠে এসেছে একজন শিল্পীর দীর্ঘ পথচলার নানা দিক। নতুন গান নিয়ে আপাতত তাড়াহুড়ো না থাকলেও সংগীতের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক যে এখনো অটুট, তা স্পষ্ট তাঁর কথাতেই।
আপনার মতামত লিখুন :