আনন্দ বিনোদন ডেস্ক: একসময় বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ছিল ‘ওটিটি’। নতুন গল্প, সাহসী নির্মাণ, তারকাবহুল ওয়েব সিরিজ এবং আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনা সব মিলিয়ে অল্প সময়েই দর্শকের মধ্যে আলাদা জায়গা করে নেয় এই মাধ্যম। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় সিনেমা হল বন্ধ থাকা এবং প্রচলিত টেলিভিশন বিনোদনে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো দর্শকের অন্যতম প্রধান বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তখন নতুন কোনো ওয়েব সিরিজ বা সিনেমা মুক্তি পেলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হতো আলোচনা। চরিত্র, গল্প, অভিনয় থেকে নির্মাণশৈলী—সবকিছু নিয়েই তৈরি হতো নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কয়েক বছর পর এসে সেই উন্মাদনায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। কমেছে কনটেন্ট প্রকাশের ধারাবাহিকতা, অনেক প্ল্যাটফর্মে বড় বাজেটের কাজের সংখ্যা কমেছে এবং দর্শকের মনোযোগও এখন আগের চেয়ে বেশি বিভক্ত।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের ওটিটি খাতে কনটেন্ট আউটপুট কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো শিল্পটির ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসায়িক মডেল, উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগের বাস্তবতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একটি মানসম্মত ওয়েব সিরিজ বা সিনেমা নির্মাণে এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ প্রয়োজন। ভালো ক্যামেরা, পোস্টপ্রোডাকশন, লোকেশন, শিল্পী, নির্মাতা ও কারিগরি দলের পাশাপাশি বিপণনেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার। অথচ সাবস্ক্রিপশন থেকে প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত না হলে প্রতিটি প্রকল্পে বড় বাজি ধরা প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে দর্শকের সামনে এখন কনটেন্টের বিকল্পও অনেক বেশি। স্থানীয় প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সেবাগুলো নিয়মিত নতুন সিনেমা, সিরিজ ও ডকুমেন্টারি প্রকাশ করছে। ফলে বাংলাদেশের কোনো কনটেন্টকে শুধু স্থানীয় বাজারে নয়, দর্শকের সময় ও মনোযোগের জন্য আন্তর্জাতিক কনটেন্টের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
ওটিটির শুরুতে দর্শক নতুন ধরনের গল্পের স্বাদ পেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধ, থ্রিলার, রহস্য ও অন্ধকার জগতের গল্পের আধিক্য দেখা গেছে। এসব গল্প জনপ্রিয় হলেও একই ধরনের নির্মাণ বারবার সামনে এলে দর্শকের আগ্রহ কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
বর্তমান দর্শক শুধু ক্রাইম থ্রিলার দেখতে চান না। পারিবারিক গল্প, রোমান্স, কমেডি, শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মাণ, ঐতিহাসিক কাহিনি, জীবনী, সামাজিক গল্প কিংবা ভিন্নধর্মী পরীক্ষামূলক কাজের প্রতিও তাদের আগ্রহ রয়েছে। তাই দর্শক ধরে রাখতে হলে গল্পের বৈচিত্র্য বাড়ানো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ওটিটি উদ্যোক্তা রেদওয়ান রনি এর আগে প্রযুক্তি ও কনটেন্ট—এই দুই বিষয়কে ওটিটি ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ এটি শুধু কনটেন্ট তৈরির ব্যবসা নয়; দর্শকের কাছে সেই কনটেন্ট কীভাবে পৌঁছাবে, কতটা সহজে দেখা যাবে এবং কীভাবে দর্শককে ধরে রাখা যাবে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অভাবও অনেক ভালো কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা সীমিত করে দিতে পারে। একটি সিরিজ তৈরি করার পর দর্শককে সেটি সম্পর্কে জানানো, আগ্রহ তৈরি করা এবং মুক্তির পর আলোচনায় ধরে রাখার জন্য পরিকল্পিত বিপণন প্রয়োজন।
একেবারেই নয়। বরং সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ডিজিটাল বিনোদন বাজার এখনো সম্ভাবনাময়। ২০২৬ সালের শুরুতেই দেশের একাধিক প্ল্যাটফর্ম নতুন ওয়েব সিরিজ, চলচ্চিত্র ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। চোরকি, হইচই, বংগো, আইস্ক্রিনসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নতুন প্রকল্পের তালিকাও রয়েছে।
টেলিকম খাতের সাম্প্রতিক তথ্যও ডিজিটাল বিনোদনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারকে ইঙ্গিত করছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাংলালিংকের ডিজিটাল সেবা থেকে আয় বছরে ২৫৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং তাদের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম টফি ২ কোটি ৬ লাখ সক্রিয় ব্যবহারকারীতে পৌঁছেছে। বিশ্বকাপের কনটেন্ট, সাবস্ক্রিপশন ও বিজ্ঞাপন এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
অর্থাৎ দর্শক ডিজিটাল মাধ্যমে নেই—এমনটা বলা যাবে না। বরং দর্শকের সময়ের জন্য প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি।
বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে ঘিরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য সরাসরি ৩০০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ডিজিটাল কনটেন্টসহ সৃজনশীল খাতকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
এ ছাড়া ইন্টারনেট সেবাদাতাদের মাধ্যমে স্ট্রিমিং সেবা প্যাকেজ আকারে দেওয়ার জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালা তৈরির বিষয়েও বিটিআরসি কাজ করছে। এমন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে দর্শকের কাছে বৈধ স্ট্রিমিং সেবা পৌঁছানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পকে আবারও গতিশীল করতে হলে শুধু বেশি কনটেন্ট তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন মানসম্মত ও বৈচিত্র্যময় গল্প, বাস্তবসম্মত বাজেট, শক্তিশালী ডিজিটাল মার্কেটিং এবং কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল।
একই সঙ্গে পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ, দর্শকের তথ্য ও পছন্দ বিশ্লেষণ, সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থাকে আরও সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক সহপ্রযোজনাও হতে পারে ভবিষ্যতের বড় সুযোগ।
সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও শিল্পসংশ্লিষ্টরা চলচ্চিত্র, ডিজিটাল কনটেন্টসহ পুরো সৃজনশীল খাতের জন্য সমন্বিত নীতিগত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পকে এখনই ‘পতনের পথে’ বলা হয়তো ঠিক হবে না। বরং করোনাকালীন দ্রুত উত্থানের পর এটি এখন বাস্তব ব্যবসায়িক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দর্শক আছে, প্রযুক্তি আছে, গল্প বলার সক্ষমতাও আছে। প্রয়োজন শুধু দর্শকের পরিবর্তিত চাহিদা বোঝা, বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সঠিক কৌশল নিতে পারলে সাময়িক এই ধীরগতি কাটিয়ে বাংলাদেশের ওটিটি আবারও নতুন গল্প, নতুন নির্মাতা এবং নতুন দর্শক নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :